চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম নগরীর আমবাগান এলাকায় রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জায়গা ঘিরে চলছে দখল-বাণিজ্য, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও কোয়ার্টার ভাড়া দেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধেও সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের পর দিন রেলওয়ের জায়গা দখল করে একের পর এক দোকানপাট, বসতঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। ফলে সরকারি সম্পত্তি যেন অনেকের কাছে ‘যার যত ক্ষমতা, তার তত দখল’—এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় উঠে এসেছে রেলওয়ের পরিবহন সহকারি কর্মকর্তা মো. মাহাতাব উদ্দিন ও চট্টগ্রাম পাহাড়তলী বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা নিগার সুলতানার নাম। অভিযোগ রয়েছে, তাদের নামে বরাদ্দকৃত সরকারি বাসা ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় করছেন।
শুধু তাই নয়, বরাদ্দকৃত বাসার সীমানার মধ্যে নিজ অর্থায়নে আরও অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণ করে, সেগুলো ভাড়া দিয়ে বছরের পর বছর অর্থ আদায়ের অভিযোগ।
চট্টগ্রাম বাংলাদেশ রেলওয়ে পরিবহন সরকারি কর্মকর্তা মোঃ মাহাতাব উদ্দিন, সরকারি বরাদ্দকৃত তার বাসাটি তিনি ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে আয় করছেন ১৫ হাজার টাকা, এবং পাশাপাশি তার সীমানার মধ্যে আরও অতিরিক্ত প্রায় ১২টি ভাড়া বাসা নির্মাণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব বাসার প্রতিটির মাসিক ভাড়া ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বলে জানা গেছে। সেই হিসাবে অতিরিক্ত নির্মিত ঘরগুলো থেকে মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকা ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি আবাসিক কোয়ার্টার ব্যক্তিগতভাবে ভাড়া দিয়ে আয় করা এবং বরাদ্দকৃত জায়গায় অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি বিধিবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ের পরিবহন সহকারি কর্মকর্তা মো. মাহাতাব উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি একা নন; আরও অনেক কর্মকর্তা এ ধরনের কাজে জড়িত রয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অন্যরা যেভাবে দখল-বাণিজ্য করছেন, তিনিও একইভাবে করছেন।
তার এমন বক্তব্য ঘিরে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারে অনিয়ম যদি হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কার?
অন্যদিকে চট্টগ্রাম পাহাড়তলী বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা নিগাত সুলতানার কাছে বাসা ভাড়ার বিষয়ে কিংবা অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া আদায়ের বিষয়টি জানতে চাইলে, তিনি সাথে সাথে উত্তেজিত হয়ে পড়েন, এবং সম্পূর্ণ বিষয়টি অস্বীকার করেন, যদিও এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে ।
অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ে বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদ বলেন, তিনি অল্প কিছুদিন আগে দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই বিষয়টি সম্পর্কে আগে জানা ছিল না। তবে অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত করে দেখবেন এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
রেলওয়ের আইডব্লিউ (I.W.) কর্মকর্তা মোঃ সোহেল বলেন, ওনার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান মাসের জরিপে তার আওতাধীন রেলওয়ের মোট কোয়ার্টারের সংখ্যা ৩ হাজার ৫১১টি। এর মধ্যে স্টাফদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৮৫৯টি, খালি রয়েছে প্রায় ৪০০টি এবং লেভেল ক্রসিংয়ের জন্য রয়েছে ২৫২টি বাসা।
এই বিপুলসংখ্যক কোয়ার্টার ও রেলওয়ের জায়গাকে ঘিরে অবৈধ দখল, দোকানপাট নির্মাণ, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা তৈরির অভিযোগ রয়েছে।
আইডব্লিউ কর্মকর্তা সোহেল জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ নানা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধভাবে রেলওয়ের বাসা, দোকানপাট ও স্থাপনা দখলের অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে। এসব অবৈধ দখল উচ্ছেদের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় রেলওয়ে প্রকৌশলী-২-এর পক্ষ থেকে নিয়মিত নোটিশ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, বিষয়গুলো নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্তের পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশা করছেন তারা।
একদিকে রেলওয়ের জায়গা ও কোয়ার্টার দখলের অভিযোগ, অন্যদিকে সরকারি আবাসিক ভবন ভাড়া দিয়ে অর্থ উপার্জন এবং বরাদ্দকৃত জায়গায় অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ—সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম আমবাগান এলাকার রেলওয়ে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
সরকারি সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদেরই কারও বিরুদ্ধে যদি দখল ও ভাড়া-বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন প্রশ্ন একটাই—রেলওয়ের সম্পত্তি কি সত্যিই সবার? নাকি সরকারি জায়গা দখল করে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহারের বিরুদ্ধে এবার কঠোর পদক্ষেপ নেবে কর্তৃপক্ষ?