রিয়াজুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের অন্যতম প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, মুফাসসিরে কোরআন ও জননন্দিত বক্তা আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী (রহ.)-এর আজ দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর মৃত্যুতে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুর জেলার সাদারঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই ইসলামি শিক্ষা অর্জনে মনোনিবেশ করেন এবং পরবর্তীতে দেশ-বিদেশের বহু মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। কোরআনের ব্যাখ্যা, হাদিসের বিশ্লেষণ এবং ইসলামের দাওয়াতি কর্মে তিনি বিশেষভাবে খ্যাতি অর্জন করেন। সাঈদীর অনবদ্য তাফসির মাহফিল, অসংখ্য ওয়াজ-মাহফিল এবং লেখনী বাংলাদেশের ইসলামপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে দেশের গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে শহরের মসজিদ-মাদ্রাসা পর্যন্ত তাঁর তাফসির মাহফিল ছিল সমান জনপ্রিয়। তাঁর বাচনভঙ্গি, গভীর জ্ঞান ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনা শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। শুধু বাংলাদেশে নয়, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের নানা দেশে প্রবাসী মুসলিমদের মধ্যেও তাঁর দাওয়াত পৌঁছেছিল।
আল্লামা সাঈদী জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন এবং জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক ও দাওয়াতি জীবন সমানভাবে আলোচিত ও সমালোচিত ছিল।
২০১০ সালে তিনি গ্রেফতার হন এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলে। দীর্ঘ কারাজীবনেও তিনি ধৈর্য, ইবাদত ও তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করেন। কারাগারে থেকেও তাঁর ইলমী ও আধ্যাত্মিক প্রভাব বজায় ছিল।
২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন ইসলামি সংগঠন ও ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে শোকের ঢেউ বয়ে যায়। দেশ-বিদেশের হাজারো মানুষ তাঁর জানাজায় শরিক হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বৃহৎ পরিসরে আয়োজন সম্ভব হয়নি।
আল্লামা সাঈদীর তাফসির মাহফিল, অডিও-ভিডিও বক্তৃতা এবং গ্রন্থসমূহ আজও ইসলামি জ্ঞানপিপাসুদের জন্য প্রেরণার উৎস। তিনি ধর্মীয় জাগরণ, সামাজিক সংস্কার ও নৈতিকতার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে।
দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে কোরআনখানি, দোয়া মাহফিল, তাফসির আলোচনা এবং স্মরণসভা আয়োজন করা হচ্ছে। তাঁর ছাত্র, অনুসারী ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁর রেখে যাওয়া দাওয়াতি আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছেন।
আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর জীবন ছিল ইলম, দাওয়াত ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত। মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন আলেমকে স্মরণ করা নয়, বরং ইসলাম ও সত্যের জন্য নিরন্তর সংগ্রামের এক উজ্জ্বল ইতিহাসকে স্মরণ করা।

