নিজস্ব প্রতিবেদন:
এপ্রিলের তীব্র তাবদাহে বাংলাদেশ ফের মুখোমুখি হয়েছে লোডশেডিংয়ের। চাহিদা ১৭,০ মেগাওয়াট ছাড়ালেও উৎপাদন আটকে আছে ১৪,০ মেগাওয়াটে। জ্বালানি সংকট, আমদানি নির্ভরতা আর কৃষি অগ্রাধিকারের চাপে গ্রামে ১০ ঘণ্টা, শহরে ২-৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে মানুষ। এই সংকট কি সাময়িক, নাকি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত?
*অন্ধকারের পুনরাবৃত্তি*
ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা আসমাউল হোসনার দিন কাটে ৮ মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে। সকাল থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ গেছে ছয়-সাতবার। প্রতিবার ২০ থেকে ৩০ মিনিটের জন্য। বাইরে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি। ফ্যান নেই, ঘুম নেই, স্বস্তি নেই।
এই দৃশ্য শুধু তারাকান্দার নয়। এপ্রিল ২০২৬-এ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আবার চাপের মুখে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১৭,০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে, কিন্তু উৎপাদন ১৩,০ থেকে ১৪,০ মেগাওয়াটের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। ঘাটতি প্রায় ৩,০ মেগাওয়াট। ফলাফল— গ্রামে ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা, শহরে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা দৈনিক লোডশেডিং।
একসময় “লোডশেডিংমুক্ত বাংলাদেশ” ছিল সরকারের গর্বের স্লোগান। কিন্তু ভূ-রাজনীতি, জ্বালানি বাজার আর অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা মিলে সেই দাবিকে ফের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
*সংকটের মূলে তিনটি ধাক্কা*
বর্তমান লোডশেডিংকে একক কারণে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এটি তিনটি ধাক্কার সম্মিলিত ফল।
*১. জ্বালানি সংকট*
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৭০ শতাংশের বেশি নির্ভর করে আমদানি করা গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপর। কিন্তু এপ্রিল ২০২৬-এ চিত্র ভয়াবহ। দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭১টিই বন্ধ বা আংশিক চালু, গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের অভাবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের চাহিদা ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দৈনিক, সরবরাহ মিলছে মাত্র ৮৭০ মিলিয়ন। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থির। এলএনজির দাম বেড়েছে, আমদানির এলসি খোলা কঠিন হয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম ও মংলার এলএনজি টার্মিনাল পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে পারছে না।
*২. আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি*
বাংলাদেশের বৃহত্তম একক বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ভারতের আদানি পাওয়ার। গড্ডার প্ল্যান্টের দুটি ইউনিট থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট আসত। এপ্রিলের মাঝামাঝি একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে যাওয়ায় সরবরাহ কমে ৭৪৮ মেগাওয়াটে নেমেছে। এক ঝটকায় দেশের গ্রিড থেকে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উধাও।
এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, আমদানি নির্ভরতা যত বাড়বে, বহিঃশক্তির ধাক্কায় দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা তত বেশি কাঁপবে।
*৩. মৌসুমি চাহিদা ও কৃষি অগ্রাধিকার*
এপ্রিল-মে মাস বোরো ধানের সেচ মৌসুম। কৃষিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না দিলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। তাই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কৃষিকে অগ্রাধিকার দিতে শহরেও লোডশেডিং করতে হবে।
ঢাকায় ১ মেগাওয়াট পরীক্ষামূলক লোডশেডিং শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আনিন্দা ইসলাম অমিত সংসদে বলেছেন, “গ্রামে কৃষক সেচ পাবে না, আর শহরে এসি চলবে— এটা হতে পারে না। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ”।
*গ্রাম বনাম শহর: বৈষম্যের বাস্তবতা*
লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় অভিযোগ বৈষম্য নিয়ে। পল্লী বিদ্যুতের তথ্য বলছে, নেত্রকোনার কলমাকান্দায় ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ১৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। চাহিদা ৪৮ মেগাওয়াট, সরবরাহ ২ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে ঢাকায় পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির আওতায় কোনো লোডশেডিং নেই। শুধু রুরাল ইলেকট্রিফিকেশন বোর্ডের আওতাধীন এলাকায় ৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কাটছাঁট হচ্ছে।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এর জ্যেষ্ঠ জেনারেল ম্যানেজার মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, চাহিদা ৬ মেগাওয়াট, সরবরাহ ৩২ থেকে ৩৫ মেগাওয়াট। লোডশেডিং করে সামাল দিতে হচ্ছে।
এই বৈষম্য নতুন নয়, কিন্তু ২০২৬ সালে সরকার নিজেই স্বীকার করে নিয়েছে বৈষম্য কমাতে হবে। প্রশ্ন হলো, এই বণ্টন ন্যায়সঙ্গত কি না।
*ত্রিমুখী আঘাত: অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য*
লোডশেডিংয়ের প্রভাব শুধু ফ্যান-লাইট বন্ধ হওয়ায় সীমিত নয়।
*অর্থনীতি:* ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদন কমেছে ১৫-২০ শতাংশ। জেনারেটরের ডিজেল খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের অর্ধেক উধাও। দোকানপাট রাত ৮টার পর বন্ধ রাখার নির্দেশে ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ বাড়ছে। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লার সঙ্গে পাথর ঢুকে বয়লার পাইপ ফেটে যাওয়ায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
*শিক্ষা:* এসএসি-এইচএসি পরীক্ষার সময়ে রাতের লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের জন্য অভিশাপ। অনলাইন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট জমা, ইন্টারনেট ভিত্তিক পড়াশোনা সবই ব্যাহত।
*স্বাস্থ্য:* বরিশাল নগরীতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে মানুষ অতিষ্ঠ। হাসপাতাল ও ওষুধ সংরক্ষণে ঝুঁকি বাড়ছে। গরমে হিট স্ট্রোক, ডায়রিয়া, ডিহাইড্রেশনের রোগী বাড়ছে।
*সরকারের পদক্ষেপ: স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা*
সরকারের প্রতিক্রিয়া দুই স্তরের।
*স্বল্পমেয়াদে:*
১. দোকান-মার্কেট রাত ৮টার পর বন্ধ।
২. মসজিদে এসি বন্ধ রাখার নির্দেশ।
৩. সরকারি অফিস ভার্চুয়াল পরিচালনার পরিকল্পনা।
৪. সিএনজি পাম্প সপ্তাহে একদিন বন্ধ রাখা।
৫. ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রাখা।
এই পদক্ষেপগুলো দিনে ২০০-৩০ মেগাওয়াট সাশ্রয় করতে পারে বলে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের ধারণা।
*দীর্ঘমেয়াদে:*
১. রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট ২০২৬ সালের শেষে উৎপাদনে আসার কথা। এতে ১২০০ মেগাওয়াট যোগ হবে।
২. মাতারবাড়ি ১২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র পুরোদমে চালু হচ্ছে।
৩. সৌর বিদ্যুতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ মেগাওয়াট লক্ষ্য।
৪. বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের ১৪,০ কোটি টাকার বকেয়া পরিশোধ করে কেন্দ্রগুলো সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
*সমাধান কোথায়? চারটি প্রস্তাব*
সংকট সাময়িকভাবে মোকাবিলা করা গেলেও কাঠামোগত সমাধান ছাড়া টেকসই উন্নতি সম্ভব নয়।
*প্রথমত, জ্বালানি মিশ্রণ বদলাতে হবে:* গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ বাড়াতে হবে। বর্তমানে নবায়নযোগ্য শক্তির অবদান মাত্র ৪ শতাংশ। এটা ২০ শতাংশে নিতে পারলে আমদানি নির্ভরতা কমবে।
*দ্বিতীয়ত, সিস্টেম লস কমাতে হবে:* পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত বিদ্যুতের ১২-১৪ শতাংশ সঞ্চালন ও চুরিতে নষ্ট হয়। স্মার্ট মিটার, প্রি-পেইড মিটার, ডিজিটাল মনিটরিং ছাড়া এই ক্ষতি কমবে না।
*তৃতীয়ত, চাহিদা ব্যবস্থাপনা:* শিল্পকারখানায় পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ ব্যবহারে অতিরিক্ত চার্জ, আবাসিকে স্ল্যাব ভিত্তিক ট্যারিফ, এনার্জি এফিশিয়েন্ট যন্ত্রপাতি ভর্তুকি— এসব নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এসি ২৫ ডিগ্রিতে রাখলে ১০-২০০ মেগাওয়াট লোড কমানো সম্ভব বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
*চতুর্থত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা:* কোন এলাকায় কখন কত ঘণ্টা লোডশেডিং হবে, তার শিডিউল ৬৪ জেলার জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন এখনো ঢিলেঢালা। জনগণকে তথ্য দিলে অসন্তোষ কিছুটা কমে।
*জনমত ও রাজনীতি*
লোডশেডিং কখনো শুধু কারিগরি ইস্যু থাকে না, রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে যায়। এপ্রিলে কুমিল্লার দেবীদ্বারে সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজেই রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা বিদ্যুৎ অফিস ভাঙচুর করেছে।
সরকার জানে, টানা লোডশেডিং জনপ্রিয়তায় ধাক্কা দেয়। তাই এবার কৌশল বদলেছে— “সবাই কষ্ট করবে, কিন্তু কৃষক বাঁচবে” এই বার্তা দিয়ে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
*উপসংহার: অন্ধকার পেরিয়ে আলো*
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের স্থাপিত ক্ষমতা এখন ২৮,০ মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু বাস্তব উৎপাদন ক্ষমতা তার অর্ধেকের কাছাকাছি। এর মানে সমস্যা ক্ষমতার নয়, জ্বালানি ও ব্যবস্থাপনার।
২০২৬ সালের সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন মানে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন নয়। উন্নয়ন মানে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, সুষম বণ্টন, এবং ভবিষ্যতের জন্য টেকসই পরিকল্পনা।
রূপপুর, মাতারবাড়ি, সৌর প্রকল্প চালু হলে ২০২৭ সাল নাগাদ পরিস্থিতি বদলাবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত নাগরিকদের সাশ্রয়ী হতে হবে, সরকারকে স্বচ্ছ হতে হবে, আর নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদি ভাবতে হবে।
বিদ্যুৎ শুধু আলো দেয় না। এটি কৃষকের সেচ, শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, কারখানার উৎপাদন, হাসপাতালের জীবন রক্ষার যন্ত্র চালায়। সেই আলো নিভে গেলে শুধু ঘর নয়, স্বপ্নও অন্ধকার হয়ে যায়।
তাই লোডশেডিংকে শুধু গরমের অভিশাপ ভেবে এড়িয়ে গেলে চলবে না। এটা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। এবং এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

