নিজস্ব প্রতিবেদক:
শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন স্বচ্ছ ও সরল জীবনের অধিকারী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত নম্র, মৃদুভাষী এবং ইসলামী ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় এবং ইসলামিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর এবং দেশের প্রথম সারির রাজনৈতিক ব্যক্তি। তার রেখে যাওয়া কর্ম এবং নছিহত এ মুসলিম উম্মাহর জন্য বিশেষ পাওয়া।
জন্ম ও শৈশবঃ শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ১৯৪৩ সালের ৩১ মার্চে পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার সবুজে ঘেরা মনমথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম লুৎফর রহমান খান, যিনি একজন খোদা ভীরু এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক ছিলেন।
শিক্ষাজীবনঃ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী লেখাপড়ার হাতেখড়ি নিজ গ্রামের প্রাইমারি স্কুলেই। এরপর সাঁথিয়ার বোয়াইলমারী কামিল মাদ্রাসা হয়ে শিবপুর ত্বহা সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে সমগ্র বোর্ডে ১৬ তম ও ১৯৬১ সালে ফাজিল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৩ সালে মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা থেকে মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে কামিল পরীক্ষায় ফিকাহ শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৬৭ সালে কৃতিত্বের সাথে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী লাভ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনঃ ১৯৭৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর শামসুন্নাহারের সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। শামসুন্নাহার নিজামী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ থেকে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনিও ছাত্রীজীবন থেকে ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী চার ছেলে ও দুই কন্যাসন্তানের জনক।
রাজনৈতিক জীবনের সূচনাঃ ১৯৬১ সাল থেকে ইসলামি ছাত্রসংঘের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ছাত্র আন্দলোনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ওই সময় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য আন্দোলন করছিলো। ১৯৬২-৬৩ সালে কামিল শেষ বর্ষের মেধাবী ছাত্রনেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিসহ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
রাজনৈতিক কর্মকান্ডঃ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ছাত্রনেতা। ছাত্রজীবন শেষে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। তিনি পর্যায়ক্রমে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হিসেবে ১৯৭৯-১৯৮২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সংগঠনের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন এবং ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থাকেন। ১৯৮৮ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত একটানা ১২ বছর মাওলানা নিজামী জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯ নভেম্বর, ২০০০ সালে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বাংলা জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমীর নির্বাচিন হন, এই পদে তিনি শাহাদতের (১১ মে, ২০১৬ খ্রি.) আগ পর্যন্ত অধিষ্ঠিত ছিলেন।
রাষ্ট্রীয় পদঃ জাতীয় ও আন্তজার্তিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জাতীয় সংসদে উপস্থাপনা ও সময়োপযোগী বক্তব্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলনেতার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সফলতার সাথে কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয় (২০০১-২০০৬) পরিচালনা করেন। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয়ে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছেন। তার সততা, দক্ষতা ও ত্যাগ পুরো দেশকেই প্রভাবিত করে।
অবদানঃ দেশ গঠন ও জাতীয় উন্নয়নে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি শিল্প মন্ত্রী থাকাকালীন চিনি শিল্পে প্রায় ৭০ কোটি টাকা মুনাফা অর্জনসহ ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। তিনি কৃষি খাতকে ত্বরান্বিত করার জন্য চাষির বাড়িতে ‘চাষির বাড়ি বাগান বাড়ি’ শ্লোগানে উন্নয়নমূলক যে মডেল কর্মসূচি গ্রহণ করেন, যার ধারাবাহিকতায় আজও ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। তিনি দেশের শিক্ষার মান উন্নয়নে সর্বদা কাজ করে গেছেন। তার হাতেই গড়া অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও নানা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ার সাথে সংযুক্ত ছিলেন।
প্রকাশনা ও লেখালেখিঃ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী কারাবরণ করার পূর্বে মুসলিম উম্মাহর জন্য অনেকগুলো বই লিখেন, কারাবরণ করেও থামেনি তার কলম, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লিখেই চলেছিলেন। ছোট-বড় গ্রন্থ নিয়ে তিনি মোট প্রায় ৩০ টি বই লিখেন, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য: গণতন্ত্র গণবিপ্লব ও ইসলামী আন্দোলন, ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ, স্মৃতির পাতা থেকে, কুরআনের আলোকে মু’মিনের জীবন, নারী সমাজে দাওয়াত ও সংগঠন সম্প্রসারণের উপায়, কারাগারের স্মৃতি, রাসূলুল্লাহর (সাঃ) মক্কার জীবন।
মৃত্যুঃ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জোরপূর্বক দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়ার পর ২০১৬ সালের ১১ই মে বুধবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই ফাঁসির রায় সম্পূর্ণ ভূয়া, মিথ্যা ও বানোয়াট এবং রাজনৈতিক হত্যার স্বীকার হয়েছেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। মূলত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলকে দূর্বল করার জন্যই এই হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়।
জানাজাঃ শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় তার নিজ জন্মস্থান সাঁথিয়ার মনমথপুরে। একই জায়গায় ২৬ বার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় যা ইতিহাসে এক দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকবে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় জানাজা হওয়ার পাশাপাশি দেশের বাইরেও জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। (সংক্ষেপিত)

