মোঃ জয়নাল আবেদীন:
রেলওয়ের সরকারি জমি যেন স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা দখলকারীদের পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে! বছরের পর বছর, এমনকি বংশানুক্রমে রেলের জমি দখল করে ভোগবিলাস করাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানেই শেষ নয়; বাণিজ্যিক ও কৃষি লাইসেন্সের দোহাই দিয়ে রেলওয়ের কঠোর নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একের পর এক গড়ে তোলা হচ্ছে অবৈধ স্থায়ী অবকাঠামো।
নীতিমালার তোয়াক্কা না করে আবাসিক হোটেল নির্মাণ
রেলওয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্সকৃত বা লিজ নেওয়া জমিতে কোনো অবস্থাতেই স্থায়ী (ইট, রড, সিমেন্ট বা কংক্রিটের) অবকাঠামো নির্মাণ করার কোনো বিধান নেই। বাণিজ্যিক লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী কেবল কাঁচা ঘর, বাঁশ-কাঠের কাঠামো বা বড়জোর সেমি-পাকা টিনশেড ঘর তৈরি করা যায়। কিন্তু সীতাকুণ্ডে এই আইনের নজিরবিহীন লঙ্ঘন ঘটিয়ে চলেছেন সীতাকুণ্ড পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোঃ সাইফুল ইসলাম (৪০)।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, চারদিকে উঁচু টিনের বেড়া দিয়ে ভেতরে অত্যন্ত গোপনে ইট, রড ও সিমেন্ট দিয়ে পাকা রুম তৈরি করছেন সাইফুল। যা সম্পূর্ণ স্থায়ী এবং অবৈধ অবকাঠামোর আওতায় পড়ে। মূলত বাণিজ্যিক লাইসেন্সের আড়ালে সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে একটি বহুতল আবাসিক হোটেল, যার পেছনে আরও তিনজন শেয়ারহোল্ডার জড়িত রয়েছেন। অথচ সাধারণ বাণিজ্যিক লাইসেন্সের অধীনে আবাসিক হোটেল নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি। শুধু তাই নয়, একই জায়গায় সাইফুলের আরেকটি স্থায়ী আবাসিক ভবন রয়েছে, যেখানে তার পরিবার রীতিমতো বসবাস করছে।
“আওয়ামী লীগও কিছু করতে পারেনি, এখন তো অন্য হিসাব!”
সরেজমিনে স্টেশন মাস্টার নাজিমুদ্দিনের কক্ষে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অভিযুক্ত সাইফুল ইসলামকে ডেকে আনেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে সাইফুল তার রাজনৈতিক পরিচয় (ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি) ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি দাবি করেন, তার কাছে ‘ফার্ম’ করার বাণিজ্যিক লাইসেন্স রয়েছে।
আইন অনুযায়ী স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ যে দণ্ডনীয় অপরাধ—তা মনে করিয়ে দেওয়া হলে অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ সুরে সাইফুল বলেন:
“আমাকে আওয়ামী লীগও কিছু করতে পারেনি, আর এখন তো অন্য হিসাব! আমি ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি, আমাকে এসব (আইন) দেখিয়ে লাভ নেই।”
এদিকে স্টেশন মাস্টার নাজিমুদ্দিনের কাছে সাইফুলের লাইসেন্সের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। রেলের জমিতে এই প্রকাশ্য অবৈধ কর্মকাণ্ডের দায় এড়াতে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “রেলওয়ের জমিতে কে কী করছেন, এই বিষয়টি আমার আওতাধীন নয়।” তার এই উদাসীন ভূমিকা ও বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা স্থানীয়দের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সীতাকুণ্ডজুড়ে চলছে লিজের নামে হরিলুট
রেলওয়ের জমি কামড়ে ধরে রাখার এই মহোৎসবে সাইফুল একা নন। একই সড়কে এভারগ্রীন স্কুলের সামান্য সামনে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করছেন জামাল নামের আরেক ব্যক্তি। এছাড়া কলেজ রোড গেইট ব্যারিয়ারের পাশে অবৈধভাবে দোকান তুলেছেন বাচ্চু। অভিযোগ রয়েছে, বাচ্চুর এই অবৈধ দোকানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ৫০ হাজার টাকার স্থূল অঙ্কের এক গোপন লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে।
রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি এভাবে কতিপয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের পকেটে চলে যাওয়া এবং প্রশাসনের নাকের ডগায় স্থায়ী ভবন নির্মাণ করার পরও কোনো দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে এই অবৈধ লিজ বাতিল করে স্থায়ী স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হোক এবং এর সাথে জড়িত কর্মকর্তা ও দখলদারদের আইনের আওতায় আনা হোক।
এই বিষয়ে প্রধান ভূ সম্পত্তি কর্মকর্তা (পূর্বাঞ্চল) বলেন, বাণিজ্যিক লাইসেন্সের নামে স্থায়ী অবকাঠামো সম্পূর্ণ অবৈধ।অবৈধ দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

