নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
মৌলভীবাজারে কথিত সীমানা পিলার ও প্রাচীন কয়েন ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে একটি প্রতারক চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—রাজনগর উপজেলার বাংলা টিলা (পণ্ডিত নগর) গ্রামের এস.এম. ইলিয়াছুর রহমান (৩৬), শ্রীমঙ্গল উপজেলার উত্তর ভাড়াউড়া গ্রামের মো. ইকরাম মিয়া (২৮), ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার শ্যামলী এলাকার তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান (৬১) এবং একই থানার মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকার মো. ইব্রাহিম বেপারী (৩৭)।
মৌলভীবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা এবং ডিবির অফিসার ইনচার্জ সুদীপ্ত শেখর ভট্টাচার্যের দিকনির্দেশনায় এসআই আহলাদ ইবনে জামিল, পিপিএমের নেতৃত্বে একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে শ্রীমঙ্গল এলাকা থেকে এস.এম. ইলিয়াছুর রহমান ও মো. ইকরাম মিয়াকে এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান ও মো. ইব্রাহিম বেপারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানে তাদের কাছ থেকে কথিত ২০০ কোটি টাকা মূল্যের একটি ‘এন্টিক পাওয়ার কয়েন’, একটি নোহা গাড়ি, একটি পকেট রাউটার, আটটি মোবাইল ফোন, বিভিন্ন নামে ৫০০টি ভিজিটিং কার্ড, ৯৪ পাতার কথিত ভুয়া বিজনেস এগ্রিমেন্ট, তিনটি চেকবই, একটি কয়েন ব্ল্যাংক অ্যালবাম, একটি ডায়েরি, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ১০টি সিমকার্ড, ১০০ টাকা মূল্যমানের ছয়টি ভুয়া স্ট্যাম্প এবং ‘এন্টিক গ্যালারি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর নামে একটি কথিত ভুয়া সার্টিফিকেট জব্দ করা হয়েছে।
ডিবি পুলিশের দাবি, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে প্রতারণা করে আসছিল। এর মধ্যে Heritage Auction, Lockheed Martin ও BlackRock-এর মতো প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের প্রতিনিধি পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালেও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে একই ধরনের প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এই চক্রের সদস্য তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামানসহ চারজন।
পুলিশ ও মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার বালিসহস্র গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস আগে পূর্বপরিচিত এস.এম. ইলিয়াছুর রহমানের মাধ্যমে কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের পরিচয় হয়। তারা দাবি করেন, চাতলাপুর চা বাগানের কয়েকজনের কাছে ব্রিটিশ আমলের একটি অত্যন্ত মূল্যবান ধাতব বস্তু রয়েছে, যার মূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি। ঢাকার একটি পক্ষ সেটি কিনতে আগ্রহী এবং মধ্যস্থতা করতে পারলে বিপুল অর্থ লাভ করা যাবে—এমন প্রলোভন দেখানো হয়।
পরবর্তীতে ভিকটিমের আমেরিকাপ্রবাসী মামাতো ভাই মির্জা খালেদুর রহমানকেও বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, চক্রের সদস্য তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান নিজেকে ‘US Heritage Auction’-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর পরিচয় দিয়ে কথিত ক্রয়ের বিষয়ে যোগাযোগ করেন। এভাবে কথিত ক্রেতা, বাগান মালিকপক্ষ ও মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে পুরো বিষয়টিকে বড় ধরনের বৈধ ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
এরপর কথিত ধাতব বস্তুটির সত্যতা যাচাইয়ের নামে একজনকে ‘এক্সপার্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট ওই ব্যক্তি চাতলাপুর চা বাগানে গিয়ে বস্তুটি পরীক্ষা করে মূল্যবান ও আসল বলে জানায়। এতে ভিকটিম ও তার মামাতো ভাইয়ের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়।
পরবর্তীতে বাগানীদের অর্থ দেওয়ার কথা বলে ভিকটিমের মামাতো ভাইয়ের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা করে মোট চারটি স্বাক্ষরিত চেক নেওয়া হয়। তবে চেক নেওয়ার পরও কথিত লেনদেন সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর কথিত মূল্যবান বস্তুটি ঢাকার ক্রেতার কাছে হস্তান্তরের কথা বলে ভিকটিম, তার মামাতো ভাই, কথিত ক্রেতা পক্ষের প্রতিনিধি ও ‘এক্সপার্ট’কে চাতলাপুর চা বাগানে নেওয়া হয়। সেখানে বস্তুটি পুনরায় পরীক্ষা করে সঠিক বলে দাবি করা হয়। একপর্যায়ে একটি বক্সে করে কথিত বস্তুটি ভিকটিম ও তার মামাতো ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে নগদ দুই কোটি টাকা নেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, একই সময়ে আরও দেড় কোটি টাকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে মোট সাড়ে তিন কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে—এমন বিশ্বাস সৃষ্টি করা হয়। এরপর বক্সটি তাদের কাছে রেখে দুই দিন পর আরও ১০ কোটি টাকা দেওয়ার পর কথিত মূল্যবান বস্তুটি নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়।
ভিকটিম ও তার মামাতো ভাই বক্সটি সিলেটে নিয়ে যাওয়ার পর নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হলে সেটি খুলে দেখতে পান, ভেতরে কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু নেই; বরং একটি সাপ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে চক্রের সদস্যরা বিভিন্নভাবে তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে।
একপর্যায়ে চক্রের এক সদস্য দাবি করে, টাকা নিয়ে বিরোধের কারণে কথিত ‘আইটেম’ জিনের মাধ্যমে সাপে পরিণত হয়েছে এবং ২১ দিন পর সেটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। পরে আরও একটি মূল্যবান বস্তু পাওয়ার কথা জানিয়ে সেটির ব্যবসার জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানানো হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, আগের টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় এবং নতুন কথিত বস্তুটি পাওয়ার প্রত্যাশায় ভিকটিম আরও ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো মূল্যবান বস্তু কিংবা পূর্বে দেওয়া অর্থ ফেরত না পেয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এ সময় কয়েকজনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং অন্যরা বিভিন্নভাবে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে।
পরবর্তীতে ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে ভিকটিমের কাছে প্রতীয়মান হয়, কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান, ‘এক্সপার্ট’ এবং বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে তার ও তার মামাতো ভাইয়ের বিশ্বাস অর্জন করে অর্থ ও চেক গ্রহণ করেছে।
ভিকটিমের অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে সর্বমোট প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ২০২৪ সালে কুলাউড়া থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক লাভের প্রলোভনে পড়ে অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।

